
আপনাদের কি মনে হয় আমরা সন্ত্রাসী? মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে বলা বা মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কথা বলা, এগুলো কি সন্ত্রাসী কাজ? দেশের সূর্য সন্তানেরা এই দেশের জন্য যুদ্ধ করেছেন। এ দেশকে যারা স্বাধীন করেছেন, তাদের সঙ্গে থাকা মানে কি সন্ত্রাসী কাজ করা? গতকাল শুক্রবার ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত চত্বরে এসব মন্তব্য করেছে গ্রেপ্তারকৃত সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম পান্না। এদিন শাহবাগ থানার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় সাবেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী, ঢাবির অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন, সাংবাদিক পান্নাসহ ১৬ জনকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সারাহ ফারজানা হক। গতকাল শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে আসামিদের আদালতে হাজির করে হাজতখানায় রাখা হয়। এরপর সাড়ে ১০টায় তাদের সবার মাথায় হেলমেট, বুকে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ও অধ্যাপক কার্জন বাদে বাকিদের হাতকড়া দিয়ে বেঁধে এজলাসে তোলা হয়। তোলার সময় হাতকড়া পরানো অবস্থায় হাত উঁচু করে সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম পান্না বলেন, সাংবাদিকরা সন্ত্রাসী-দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে এই হাতে লেখে। দেখেন, আমার এই হাতেই হাতকড়া। এসময় তিনি হাত কড়াসহ দুই হাত উঁচু করে সাংবাদিকদের দেখান। তিনি বলেন, বলুন, সাংবাদিকরা কী লিখবে? কার পক্ষে লিখবে? এসময় এক সাংবাদিক তাকে প্রশ্ন করেন, আপনাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদের যে অভিযোগ, সেটা কতটুকু সত্য? জবাবে পান্না বলেন, আপনাদের কি মনে হয় আমরা সন্ত্রাসী? মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে বলা বা মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কথা বলা এগুলোকে কি সন্ত্রাসী কাজ বলে? পরে তাদের কাঠগড়ায় রাখা হয়। শুনানি শুরু হলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও শাহবাগ থানার উপপরিদর্শক তৌফিক হাসান সবাইকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন। শুনানিতে অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর মো. শামসুদ্দোহা সুমন সব আসামিকে কারাগারে আটক রাখার আবেদনের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। পান্নার আইনজীবী ফারজানা ইয়াসমিন রাখী তার জামিন চান। শুনানির সময় পান্না হাত উঁচু করে কথা বলতে চান। তখন বিচারক বলেন, আপনার আইনজীবী আছে নাহ? তখন আসামি বলেন, হ্যাঁ। তাও কিছু বলতে চাই। এ সময় পান্না বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কথা বলা কি দোষ? আমরা সাংবাদিকরা কি কথা বলতে পারবো না? তখন রাষ্ট্রপক্ষের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর কাইয়ুম হোসেন নয়ন এর বিরোধিতা করেন। এ আইনজীবী বলেন, এই সাংবাদিক আওয়ামী লীগের সহযোগী। এত বছর সুবিধা নিয়ে এখন আদালতে সবাইকে থামিয়ে দিয়ে কথা বলতে চায়। তখন আসামি পান্না ও আইনজীবী নয়ন— দুদিক থেকে উঁচু স্বরে কথা বলতে থাকেন। এতে এজলাসজুড়ে হট্টগোল দেখা যায়। এরপর শুনানি শেষে আদালত আসামিদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। সকাল ১১টা ২১ মিনিটের দিকে শুনানি শেষে সাংবাদিক পান্নাসহ সব আসামিকে সিএমএম আদালতের হাজতখানায় নেওয়া হয়। তখন আদালত চত্বরে সাংবাদিকদের দেখে চিৎকার করে পান্না বলেন, এই দেখেন আমার হাতে হাতকড়া। তিনি তার পেছনের দিকে বাঁধা হাত দেখানোর চেষ্টা করলে পুলিশ সদস্যরা তাকে বাধা দেন। আবারও পান্না চিৎকার করে বলেন, হাতকড়া পরাবেন, দেখাতে দেবেন না। এটা কোন ধরনের কথা। তিনি বারবার এই কথা বলতে থাকেন। এরপর তাকে হাজতখানায় নেওয়া হয়। পরে সকাল ১১টা ৫১ মিনিটে সিএমএম হাজতখানা থেকে আসামিদের কেরানীগঞ্জ কারাগারে নেওয়ার জন্য প্রিজনভ্যানে ওঠানো হয়। প্রিজনভ্যান থেকে পান্না গ্রিলের ফাঁক দিয়ে উঁকি মেরে বলেন, সাংবাদিকরা কি কথা বলতে পারবেন না, সাংবাদিকদের হাতে হাতকড়া, এটা কোন দেশ? কোথায় আছি আমরা। এরপর প্রিজনভ্যান আদালত চত্বর ছেড়ে যায়। প্রসঙ্গত, গত বৃহস্পতিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) একটি আলোচনা অনুষ্ঠানের জেরে শাহবাগ থানায় সন্ত্রাসবিরোধ আইনে লতিফ সিদ্দিকীসহ ১৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। অপর আসামিরা হলেন- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন, মো. আব্দুল্লাহ আল আমিন, কাজী এটিএম আনিসুর রহমান বুলবুল, গোলাম মোস্তফা, মো. মহিউল ইসলাম ওরফে বাবু, মো. জাকির হোসেন, মো. তৌছিফুল বারী খান, মো. আমির হোসেন সুমন, মো. আল আমিন, মো. নাজমুল আহসান, সৈয়দ শাহেদ হাসান, মো. শফিকুল ইসলাম দেলোয়ার, দেওয়ান মোহাম্মদ আলী ও মো. আব্দুল্লাহীল কাইয়ুম।